বাহক নিউজ় ব্যুরো: চিসাকো কাকেহি হলেন জাপানের ‘ব্ল্যাক উইডো’। ৭৪ বছর বয়সী এই মহিলা প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর বারবার প্রেমের ফাঁদে আকৃষ্ট করেছেন পুরুষদের এবং খুন করেছেন।
কিন্তু পাপ কখনো চাপা থাকেনা, তাই শেষপর্যন্ত ধরা পড়তে হয়েছে তাকে। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর শেষপর্যন্ত চিসাকো কাকেহিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।
চিসাকোর শেষ স্বামী ইসাও কাকেহির বয়স ৭৫ বছর। দিব্যি সুস্থ মানুষ , পত্নীপ্রেমে ছিলেন অন্ধ। ২০১৩ সালে জাপানের একটি ম্যাচমেকিং এজেন্সির মাধ্যমে চিসাকোর সাথে আলাপ হয় ইসাও এর। ৬৭ বছরের বিধবা এই মহিলার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
সাক্ষাতের দুইমাসের মধ্যে বিয়ে করে কিয়েটোর মুটকো সিটিতে নিজেদের দাম্পত্য জীবন শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু ২০১৪ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর জাপানের ‘ব্ল্যাক উইডো’-র চতুর্থ ও চূড়ান্ত শিকারে পরিণত হন তিনি। বর্তমানে চিসাকো কাকেহির বয়স ৭৪ বছর। প্রেমের ফাঁদ পেতে তিনজন পার্টনারকে খুন ও চতুর্থ জনকে হত্যার চেষ্টায় মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত তিনি।
২০০৭ সাল থেকে নিজের হত্যালীলা শুরু করেন চিসাকো, সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৬১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে এতগুলো হত্যার পরেও পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৪ সালে চতুর্থ পার্টনার ইসাও কাকেহিকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে তাঁর নাম উঠে আসে এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
জাপানে এ যাবতকাল যত দীর্ঘমেয়াদী বিচার হয়েছে তার মধ্যে এই মামলা অন্যতম। ২০১৭ সালে কাকেহিকে আদালতে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আপিল করলে জুনে তাও।প্রত্যাখান করা হয়। চলতি বছরের জুন মাসে আদালতের বিচারক মন্তব্য করেন, চিসাকো কাকেহি একটি ম্যাচমেকিং এজেন্সির ব্যবহার করতেন যার মাধ্যমে প্রবীণ পুরুষদের নিজের প্রেমের জালে ফাঁসাতেন। এরপর তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করার পর বিষ প্রয়োগ করতেন।
এই ঘটনা সামনে আসার পর জাপানে উদ্বেগ দেখা যায়। বিশেষ করে ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক ও একাকীত্বে ভোগা মানুষেরা, যারা অনলাইন প্রেমের ফাঁদে বিপদে পড়তে পারেন। তবে একইসাথে একটা প্রশ্ন আসে যে, জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এক মহিলা কেন প্রেমের ফাঁদ পেতে পুরুষদের হত্যা করতেন।
চিসাকো কাকেহি জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাগা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কাজ করতেন একটি প্রিন্টিং কারখানায়। ১৯৬৯ সালে ২৩ বছর বয়সে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। ২৫ বছরের দাম্পত্য ১৯৯৪ সালে তাঁর প্রথম স্বামী অসুস্থতায় মারা যান।
ব্ল্যাক উইডোর প্রথম শিকার
২০০৭ সালে ৭৪ বছরের তোশিয়াকি সুয়েহিরোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন চিসাকো কাকেহি। সেই বছরই ১৮ ই ডিসেম্বর সুয়েহিরো ও তাঁর সন্তানদের সাথে মধ্যাহ্নভোজন সারেন তিনি। সুয়েহিরো ওষুধ খেতেন, আর সেই সুযোগে কাকেহি তাঁকে সায়ানাইড ক্যাপসুল দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী মধ্যাহ্নভোজের ১৫ মিনিটের মধ্যেই সুয়েহিরো অসুস্থ হয়ে পড়েন, এরপর অ্যাম্বুলেস ডাকা হয় কিন্তু ততক্ষণে তিনি হাঁসফাঁস করছিলেন। সুয়েহিরোকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন চিসাকো, সেখানে হাসপাতালের স্টাফদের কাছে নিজেকে ‘হিরাওকা’ বলে পরিচয় দেন তিনি। সুয়েহিরো মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রায় কিন্তু কপাল ভালো ছিল তার। সুয়েহিরোই একমাত্র ব্যক্তি যিনি চিসাকোর চারজন শিকারের মধ্যে একমাত্র যিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। ঘটনার দেড় বছর পর অসুস্থতার পর তিনি মারা যান।
ব্ল্যাক উইডোর দ্বিতীয় শিকার
এর কয়েকবছর পরেই ৭১ বছর বয়সী মাসানোরি হোন্ডার দিকে চোখ যায় চিসাকোর। একটি স্টোরের মালিক ছিলেন তিনি। ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর ডায়াবেটিস ধরা পড়লে ঘনঘন স্পোর্টস ক্লাবে যাওয়া শুরু করেন তিনি। সেখানেই চিসাকোর সাথে অন্তরঙ্গতা বাড়ে তাঁর। তাঁদের কিভাবে সাক্ষাৎ হয়েছিল বা কতদিন ডেট করছিলেন সে বিষয়ে কিছু জানা না গেলেও ওই বছরের শেষের দিকে বিয়ে করবেন বলে বন্ধুদের জানান তাঁরা। তবে ২০১২ সালের ৯ ই মার্চ হোন্ডার সাথে তাঁর স্টোরে দেখা করেন কাকেহি আর ওইদিনই বিকেলবেলা মোটরসাইকেল চালানোর সময় চেতনা হারান হোন্ডা, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে তথ্যপ্রমাণে দেখা যায়, হোন্ডার সাথে বিবাহের কোনো ইচ্ছেই ছিল না কাকেহির। হোন্ডার মৃত্যুর দুমাস আগে থেকেই তিনি এক ডেটিং এজেন্সির মাধ্যমে অন্য পুরুষদের সাথে ডেটিং করা শুরু করেন।
ব্ল্যাক উইডোর তৃতীয় শিকার
ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন মিনোরু হিওকি। তবে ২০১৩ সালে তাঁর জীবন বদলে যায়, সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। ৭৫ বছর বয়সী একাকীত্বে ভোগা এই বৃদ্ধ নতুন করে প্রেমে আগ্রহ পান। ২০১৩ সালের আগস্টে চিসাকোর সাথে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। অন্তরঙ্গতা বাড়ে, একসাথে খাবার খাওয়া থেকে একে অপরের বাড়িতে রাত্রিযাপন সবই চলতে থাকে। কিন্তু সে বছরই ২০ শে।সেপ্টেম্বর তাঁদের প্রেমের সমাপ্তি ঘটে। সেইদিন বাইরে খেতে গিয়েছিলেন যুগল। সুয়েহিরোর মতো হিওকিও খাবার পর ওষুধ খেতেন ফলে তাঁকেও একই পদ্ধতিতে সায়ানাইড ক্যাপসুল দেন চিসাকো। খাবার শেষ করার কয়েক মিনিটের মধ্যে আক্রান্ত হন হিওকো। সাথে সাথে অ্যাম্বুলেস এসে হাজির হলেও হিওকি তখন প্রায় মরণাপন্ন। হিওকির সন্তান থাকলেও এবং ক্যান্সারের থেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও অ্যাম্বুলেস ক্রু দের কাছে হিওকি একা ও তিনি ফুসফুসের ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ে আক্রান্ত বলে জানান চিসাকো। অ্যাম্বুলেস ক্রু হিওকির চিকিৎসা শুরু করতে চাইলে তাঁদের বাধা দেন কাকেহি এর ফলে দুঘন্টার মধ্যে মৃত্যু হয় তাঁর।
ব্ল্যাক উইডোর শেষ শিকার
হিওকির মৃত্যুর দুমাসের মধ্যে পরবর্তী টার্গেট ইসাও কাকেহিকে বিয়ে করেন চিসাকো। বিয়ের বড়োজোর একমাসের মধ্যে আবার অন্য পুরুষের সঙ্গে ডেটিং শুরু করেন চিসাকো। বিয়ের কয়েকসপ্তাহের মধ্যেই নতুন স্ত্রী এর সাথে মধ্যাহ্নভোজের সময় হার্টঅ্যাটাকে আক্রান্ত হন ইসাও। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে একঘন্টার মধ্যে মৃত্যু হয় তাঁর। এই মৃত্যুর পর শুরু হয় পুলিশি তদন্ত।
জাপানে শবদেহের ময়নাতদন্তের ঘটনা খুবই বিরল। অনিয়ম বা অত্যাচার করে মারা হয়েছে মনে করলেই শুধুমাত্র ময়নাতদন্ত হয়। এই মৃত্যুকে ঘিরেও সন্দেহ হয় সংশ্লিষ্টদের। ফলে ময়নাতদন্ত শুরু হয় এবং রিপোর্টে দেখা যায় হার্ট, রক্ত ও পাকস্থলীতে সায়ানাইডের ট্রেস পাওয়া যায়। ইসাও মারা যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে তদন্তের সময় চিসাকোর অ্যাপার্টমেন্টে সায়ানাইডের ক্যাপসুল ও ক্যাপসুলের খালি খোল উদ্ধার হয়। এর থেকেই সিদ্ধান্তে আসা হয় যে সায়ানাইড ব্যবহার করেই এসব পুরুষদের হত্যা করেছেন তিনি।
Published on Tuesday, 28 September 2021, 2:13 pm | Last Updated on Tuesday, 28 September 2021, 2:13 pm by Bahok Desk









