Table of Contents
Bahok News Bureau: যতীন্দ্রনাথ দাস (Jatindra Nath Das), সম্প্রতি তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হল শহীদ দিবস (Shahid Divas)। চাইলে তিনি হয়তো এইসবেতে নাই জড়াতে পারতেন। কিন্তু, তিনি কি সেটা করেছিলেন? না। পরিবর্তে, আমরণ অনশন করেছিলেন ৬৩ দিন পর্যন্ত (63 Days Long Hunger Strike)। যা ভাবতে গেলেও, রোমহর্ষক অনুভূত হয়। এইভেবে যে, তিনি কীভাবে একটানা দু মাসেরও বেশি অনশন চালিয়ে গেছিলেন। তাও আবার এমন একটা কারণে যেটা তাঁর ব্যক্তিগত ছিল না। আপনি কী জানেন? যে, কি জন্য তিনি জেল বন্দি হয়েছিলেন (Why Jatindra Nath Das was Arrested?) এবং কেনই বা তাঁকে আমরণ অনশন (Why Jatindra Nath Das Fasted?) করতে হয়েছিল? যদি, না জেনে থাকেন চলে আসুন সেই সফরে যেখানে ইতিহাসের পাতা আপনাকে হয়তো ভাবতে বাধ্য করবে। আর যদি, জেনেও থাকেন! তাহলে চেনা সফরেই চলে আসুন শহীদ যতীন্দ্রনাথ দাসের স্মরণে।
যতীন্দ্রনাথ দাসের পরিচয়:
যতীন্দ্রনাথ দাস জন্মগ্রহণ করে ২৬ অক্টোবর তারিখে ১৯০৪ সালে ক্যালকাটায় (Calcutta)। অনেক ছোট বয়সেই তিনি তাঁর মা’কে হারান। মাতা সুহাসিনী দেবী (Suhasini Devi) তাঁকে মাত্র ৯ বছর বয়সে ছেড়ে চলে যান। এই অবস্থায়, যতীন্দ্রনাথ দাস তাঁর পিতার দেখাশোনায় বড়ো হয়ে ওঠেন। তিনি পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু, মাঝে খুব কম বয়সেই স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ার কারণে তাঁরা কৈশোরের পড়াশোনা ব্যাহত হয়। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi) কর্তৃক শুরু হওয়া অসহযোগী আন্দোলনে তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে যোগ দেন। তাঁর এই পদক্ষেপের কারণে তাঁকে জেল হাজতেও যেতে হয়। আর ঠিক এই কারণেই, মাঝে তাঁর পড়াশোনা ব্যাহত হয়। যদিও, পরে সমস্ত কয়েদিদের যখন মুক্তি দেওয়া হয়, তখন তিনিও মুক্তি পেলে আবার তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন।
সাক্ষাৎ ভগত সিং-এর সঙ্গে:
যদিও, যতীন্দ্রনাথ দাস কিশোর বয়সেই সংগ্রামকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছিলেন। তবে, তাঁর সংগ্রামী জীবন নতুন মোড় নেয়। যখন তিনি ভগত সিং (Bhagat Singh)-এর সঙ্গে হাত মেলান। উল্লেখ, তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhash Chandra Bose) ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেও দাবি করা হয়। অপরদিকে, তিনি ভগত সিং(Bhagat Singh)-এর সঙ্গে হাত মেলানোর পরে এক বড়ো মাপের সংগ্রামের অংশ হন। ভগত সিং-এর পরিকল্পনা ছিল ব্রিটিশ সরকারের ভীত নড়িয়ে দেওয়ার। তিনি মুলত ‘বধির’ সরকারের কানে নিজের ‘উপস্থিতি’ জানান দিতে তথা শোনাতে চেয়েছিলেন। নিজের এই পরিকল্পনাকে রূপায়ন করার উদ্দেশ্যে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বোমা বিস্ফোরণের (Bomb Blust at Central Legislative Assembly at Delhi) সিদ্ধান্ত নেন। আর এই বিস্ফোরণের জন্য প্রয়োজনীয় বোমা বানানোর উদ্দেশ্যে তিনি বেছে নেন যতীন্দ্রনাথ দাসকে। ভগত সিং এই মর্মে তাঁকে কলকাতা (Kolkata) থেকে আগ্রায় (Agra) ডাকেন এবং তিনি এই ডাকে সাড়া দেন ও আগ্রা পৌঁছান। তাঁরই বানানো বোমা বটুকেশ্বর দত্ত (Batukeshwar Dutt) কর্তৃক ব্যবহৃত হয় ১৯২৯ সালে।
যতীন্দ্রনাথ দাস স্মরণীয় কেন?
১৯২৯ সালের ১৪ই জুন তারিখে যতীন্দ্রনাথ দাসকে ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করে এবং লাহোরের সেন্ট্রাল জেলে (Lahore Central Jail) বন্দী করে দেয়। ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত ‘নিজের পায়ে নিজের কুড়ুল মারার পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করল। কারণে তাঁকে লাহোর জেলে বন্ধী করার পরে প্রকাশ্যে এলো জেলের চরম অব্যবস্থার কথা ও ভেদভেদের অভিযোগ। তিনি জানালেন, ঠিক কীভাবে উক্ত জেলে ব্রিটিশ বন্দীদের জন্য খাদ্য ও কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয় এবং ভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বন্দীদের খাদ্য-বস্ত্র তো দূরের কথা, সেল পর্যন্তও পরিষ্কার হতো না। একপ্রকারের অমানবিক আচরণ হতো ভারতীয় কয়েদিদের সঙ্গে বলে দাবি করেন তিনি। যার ফলাফল, অসুস্থ হয়ে পড়েন যতীন্দ্রনাথ দাস।
তবে, তাঁরও নাম ছিল যতীন্দ্রনাথ দাস! ছিলেন বাংলার সন্তান। জেলের বাইরে না হোক, জেলের ভেতরে থেকেও ব্রিটিশ প্রশাসনকে ভাবতে বাধ্য করে দিয়েছিলেন। জেলে থাকার সময় তিনি দেখেছিলেন যে, জেলের রান্নাঘরে ইঁদুর ও পোকামাকড় দৌড়ে বেড়াতো। তিনি স্বাভাবিকভাবে এই ঘটনাকে আর চলতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং জেল কর্তৃপক্ষের কাছে অযত্নের ও অবহেলার অভিযোগ নিয়ে যান। এই পদক্ষেপ খুব একটা কার্যকরী না হওয়ায় তিনি অনশনের সিদ্ধান্ত নেন।
অনড় ‘যতীন’:
নিজের সিদ্ধান্তের অধীনে তিনি ১৯২৯ সালে ১৩ই জুলাই তারিখে অনশন শুরু করেন। অনশন চলাকালীন জেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও, তাঁদের সেই চেষ্টা বিফলে যায়। তিনি অনশনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। একটা সময় এমন আসে, যখন তাঁকে চাপ দেওয়া হয় অনশন ভাঙার জন্য, কিন্তু সেই চেষ্টাও তাঁদের বিফলে যায়। কিন্তু, যতই দিন পার হচ্ছিল, তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে।
এই অবস্থায় জেল কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁর পানীয় জলে কিছু ওষুধ মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। যাতে, যতীন্দ্রনাথ দাসের শরীরে কোনোরকমে পুষ্টি পৌছায়। কিন্তু, যতীন্দ্রনাথ দাসের কানে এই খবর পড়তেই, তিনি তখন থেকে জল পান করতেও অস্বীকার করতে শুরু করেন। কিন্তু, তাঁর এই সিদ্ধান্তই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতিকে আরও তরান্বিত করেছিল। এই অবস্থায় জেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে আবারও অনশন ভেঙে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। তিনি স্পষ্টভাষায় জানান যে, তাঁর দাবি পূরণ না হলে, তিনি শস্যের এক দানাও মুখে নেবেন না।
অদম্য জেদ বনাম ব্রিটিশ প্রশাসন:
যতীন্দ্রনাথ দাস যেন মাথা না নোয়ানোর শপথ নিয়েছিলেন এবং এই সিদ্ধান্তের অধীনে তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হননি। ঐতিহাসিকদের মতে, জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর অনশন ভাঙার জন্য বলপূর্বক তাঁর নাক দিয়ে নল প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছিল এবং সেই নল দিয়ে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল। জেল কর্তৃপক্ষের মনোকামনা যাতে পূর্ণ না হয়, তিনি এক ঝটকায় নিজেকে সেই নল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। আর এইসবের মাঝেই দুধ তাঁর শ্বাসনালীতে চলে যায়। যার ফলে, তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি শুধরানোর বদলে আরও খারাপ হয়ে যায়। একসময় তাঁর শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়। যদিও, এরপরেও যতীন্দ্রনাথ দাস মাথা নত করেননি, তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। অবশেষে, ১৯২৯ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর তারিখে লাহোর জেরে শোকের ছায়া দেখা দেয়, মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
Published on Friday, 16 September 2022, 12:33 am | Last Updated on Friday, 16 September 2022, 2:26 am by Bahok Desk









