লজের বিভীষিকা
(ইন্দ্রজিৎ হালদার)
ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক আগে । আমার জীবনের অতিস্মরণীয় ঘটনা গুলোর অন্যতম, যার ব্যাখ্যা দেওয়া মানে ভূত আছে স্বীকার করে নেওয়া ।
যাইহোক আসল কথায় আসি, টানা কয়েক মাস অফিস আর বাড়ি করে করে জীবন ওষ্ঠাগত। একটু হাফ ছেড়ে বাঁচতে পারলে ভালো হয়, এমন সময় অফিসের কিছু বন্ধুকে দীঘায় কটা দিন বেড়াতে যাবার কথাটা বললাম।
টানা অফিস করে করে সবারই প্রায় একই অবস্থা তাই প্রস্তাবটা কারোরই মন্দ লাগলো না। দুদিন নানা আলোচনার পর ঠিক হলো সামনের মাসের প্রথম দিকেই যাব, কারণ মাস শুরু হচ্ছে শুক্রবার, শনিবার সরকারি ছুটি। তার মানে শুক্র শনি রবি টানা তিনদিন পাবো । ঠিক হলো শুক্রবার সকালে হাওড়া থেকে ভোরে ট্রেন ধরব এবং রবিবার দুপুরের ট্রেনে ফিরব ।
দীঘায় অনেকবার গেছি প্রায় পাঁচ-ছয় বার তো হবেই । বাঙালির দীপুদা অর্থাৎ দীঘা পুরী দার্জিলিং এর মধ্যে আমার ধারণা দিঘাতেই বাঙালি বেশি যায় । হয়তো এর একটা কারণ স্বল্প দূরত্ব এবং অল্প খরচেই কটা দিন সমুদ্রের হাওয়া খেয়ে কাটিয়ে আসা যায়।
আমরা মোট জনা দশেক ছেলে যাব। আমি, শুভাশিস, মৃন্ময়, জিশান, অমিত, ওয়াসিম, পদ্মনাভ, জয়ন্ত, দেবজ্যোতি ,সুমন । সামনের মাসে যথারীতি যাওয়ার দিন ভোরে সবাই হাওড়ায় পৌছালাম সময়মতো । সকাল 6.45 এ ট্রেন এখনো প্রায় 35 মিনিট আছে তাই একটু চা খেয়ে গল্প করছি সকলে। দীঘায় থাকার অনেক জায়গা থাকলেও আমরা উঠবো একটা সরকারি লজে , লজটা ওয়াসিম বন্দোবস্ত করেছে । যাইহোক যথাসময়ে ট্রেন ছাড়লো এবং নানা গল্প গুজব করতে করতে বেলা সাড়ে এগারোটায় দীঘা পৌছালাম । আগেও বহুবার এসেছি তাই সবই চেনা স্টেশনের বাইরে ভ্যানচালক দের ভিড় এড়িয়ে একটা টোটো ভাড়া করে লজে পৌছালাম। যেহেতু সরকারি লজ তাই তার অবস্থা অন্যান্য হোটেল গুলোর মত না হলেও অবস্থান টা বেশ ভালো , একদম সমুদ্রের ধারে। লজ থেকে সমুদ্রের দৃশ্য বেশ উপভোগ করা যায় । একটু পুরনো লজটা । রাস্তা থেকে ঢোকার মুখে একটা অফিসঘর ওটাই হল রিসেপশন তারপর সিমেন্টের একটা সরু রাস্তা চলে গেছে লজ পর্যন্ত। সরু রাস্তার দু’পাশে নরম ঘাসের গার্ডেন আর তার একপাশে দোতলা লজ, এবং লজের পাশে আরো বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা । সব মিলিয়ে বেশ বড় জায়গা , কম করে কুড়ি পচিশ টা মোটরগাড়ি অনায়াসে রাখা যায় লজের সামনের গার্ডেনে। গার্ডেন বলছি কারন সামনের পুরো ফাঁকা জায়গাটা ঝাউ আর কয়েকটা ফুলের গাছে সাজানো ।
দোতলা লজটির ওপর ও নিচতলা মিলিয়ে খান কুড়িঘর আছে । উপরের ও নিচের তলার ডিজাইন প্রায় এক , দুটো তলাতেই খোলামেলা একটা ফাঁকা বারান্দা, তারপর সেটা সরু হয়ে সোজা চলে গেছে এবং তার দুপাশে এদিক-ওদিক পরপর ঘরগুলো । ঘরগুলো কিন্তু বেশ ছোট ছোট প্রত্যেকটা ঘরে একটি খাট তাতে দুজন মানুষ শোওয়া যাবে একটি টেবিল আর একটা জানলা ।
আমরা দোতলার পাঁচটা ঘর নিয়ে ছিলাম, যেহেতু ঘর গুলো ছোট তাই প্রত্যেকটি ঘরে দু’জন’ করে ছিলাম । পুরো লজটিতে আমরা ছাড়া আরও একটি ফ্যামিলি ঘুরতে এসেছিল, ওনারা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের ছোট মেয়ে নিয়ে নিচের তলার একটা রুমে ছিল ।
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন লজটা একটু পুরনো ধাঁচের , রং হয়েছিল কবে তার আন্দাজ করা মুশকিল । লম্বা বারান্দা গিয়ে ডান দিকে ঘুরে বামদিকে একটা ঘর আর ডানদিকে বাথরুম। বাথরুম বলতে কমন বাথরুম। দু’তিনটে স্নানের ঘর আর কয়েকটা টয়লেট। আমরা ছাড়া দোতালায় আর কেউ না থাকায় বাকি সব ঘরগুলোতে তালা মারা ছিল। আমরা ছিলাম দোতালার প্রথম দিকের পাঁচটি ঘরে। আমার কিন্তু লজটা বেশ পছন্দ হলো, তার একটা কারণ অবশ্যই সমুদ্রের এত কাছে আর অন্য কারণ বেশ নিরিবিলি।
অন্যবারে যখন বেড়াতে এসে অন্য যে হোটেলগুলোতে উঠেছি সেখানে এত লোক সমাগম হতো যে পুরো হোটেলটা গমগম করত। তার থেকে এই লজটা বেশ নিরিবিলি, যেন মনে হয় সময় এখানে থমকে আছে।
যাই হোক দুপুরে সবাই মিলে সমুদ্র স্নান করতে গেলাম। ভাটা পড়েছে এখন তাই সমুদ্র অনেকটা শান্ত। মাঝে মাঝে দু একটা বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে, আর সবাই আনন্দে স্নান করছে, লাফাচ্ছে। বাচ্চারা খেলছে বল নিয়ে বড়রা হুল্লোড় করছে।
স্থানীয় ক্যামেরাম্যান গুলো ক্যামেরা নিয়ে জলে নেমে ফটো তুলে দিচ্ছে , কেউ কেউ ঘোড়ার পিঠে চেপে আনন্দ করছে , আবার অনেকে ডাবওয়ালা দের শামিয়ানার তলায় চেয়ারে বসে ডাব খেতে খেতে সমুদ্র উপভোগ করছে । সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট পরিবেশ। দীঘা সেই একই রকম রয়েছে যেমনটা আগে দেখেছি ঘুরতে এসে অনেকবার । প্রায় দু’ঘণ্টা জলকেলি করে বালি মেখে পকেটে ভরে যখন লজে ফিরলাম তখন দুপুর পৌনে তিনটে ।
খিদেও পেয়েছে খুব , একে একে সবাই বাথরুমে স্নান করতে গেলাম । লজটার বাথরুমটা বেশ অদ্ভুত, যেহেতু আমরা দোতালার প্রথমদিকের কয়েকটা ঘর নিয়েছিলাম তাই বাথরুম যাওয়ার জন্য দুপাশে আরো ছয় সাতটা ঘর পেরিয়ে অনেকটা গিয়ে ডান দিকে ঘুরে আরও কিছুটা গিয়ে তারপর বাথরুম পড়ে । যাই হোক স্নান সেরে রুমে আসার সময় দেখলাম বাথরুমের দিকে যাওয়ার আগেই বামদিকে আরও একটা ঘর ও তার পিছনে রেলিং বুঝলাম এটাই দোতলার শেষ ঘর একদম শেষে, আমাদের রুম থেকে দেখা যায় না। কারণ প্রথমেই বলেছি লজ টা অনেকটা লম্বা গিয়ে ডানদিকে ঘুরেছে, অনেকটা ইংরেজির উল্টানো এল এর মত। সেই ডান দিকেই ঘুরে কিছুটা গেলে বামদিকে সেই ঘরটি আর ডান দিকে বাথরুম।লজটির পজিশন নিয়ে এত লেখার কারণ ঘটনাটা ঐ শেষ ঘরটিতেই ঘটেছিল।
যাই হোক স্নান সেরে একটা ভালো খাওয়ার হোটেল খুঁজে পেট ভরে তৃপ্তি করে খেয়ে সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসলাম। বিকেল হয়ে এসেছে, তাই রোদের তেজও কম। এক ডাব ওয়ালার শামিয়ানার তলায় বসে আসার সময় কেনা আইসক্রিম খেতে খেতে সমুদ্রের ঢেউ দেখছি। জোয়ার আসছে তাই ঢেউ অনেকখানি করে এগিয়ে আসছে। জিশান, দেবজ্যোতি উঠে ঢেউয়ের জলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে আনন্দ করছে। আমরা বাকিরা গল্প-গুজব করছি। জোরাল নোনা হওয়া আর ঢেউয়ের ক্রমাগত আওয়াজ বেশ লাগছে। জিশান, দেবজ্যোতি বাচ্চাদের মত ঢেউয়ে লাফাচ্ছে।মনে মনে ভাবছি অফিসের একঘেয়েমি ফেলে এই দুটো দিন বেশ চিন্তা মুক্ত থাকা যাবে।
সন্ধ্যে সাতটা অবধি বিচেই কাটালাম, তারপর লজে ফিরে এলাম। আসার সময় দোকান থেকে কিছু পকোড়া, চপ কিনে আনলাম। লজের বাইরের গার্ডেনে গোল করে সবাই বসেছি, মুড়ি চানাচুর সহযোগে পকোড়া, চপ খাওয়া হচ্ছে আর নানা গল্প হাসি-ঠাট্টা চলছে। নানা গল্প-গুজব চলার পর এল ভুতের প্রসঙ্গ। সেই প্রসঙ্গেও দেখলাম অনেকেরই অনেক গল্প শোনা বা অভিজ্ঞতা আছে পদ্মনাভ বেশ ভালো বক্তা। ও ওর একটা শোনা ভূতের ঘটনা বলছে। সবাই মনোযোগ সহকারে শুনছে, আমিও। আসর বেশ জমে উঠেছে।
পদ্মনাভ বলছে – “এটা আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা একটা ঘটনা। ওরা অর্থাৎ বাপ্পা আর ওর বন্ধু উত্তম সেবার কি যেন একটা মালের ডেলিভারি সেরে মেদিনীপুর থেকে মোটর গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিল। বাপ্পা চালাচ্ছিল আর উত্তম সামনের সিটে বসেছিল। মেদিনীপুর থেকে কলকাতা অনেকটাই রাস্তা, রাত তখন 12:45 হবে হাইওয়ে দিয়ে মোটর গাড়ি চালিয়ে ওরা দুই বন্ধু ফিরছিল। দুদিকে মাঠ ক্ষেত ও মাঝে মাঝে বন-জঙ্গল পরে, গাড়ি ও বেশ জোরেই চলছিল। গ্রামের এদিকে এখন নিশুতি রাত। হঠাৎ কিছু দূরে এক মেয়েকে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। দূর থেকে হর্ন বাজিয়ে দেখল সে সরছে না, ওরা তখন কি করবে বুঝতে পারছে না। এত রাতে কোন মেয়ে একা রাস্তার মাঝে কেন দাঁড়িয়ে থাকবে? গাড়ি থামাবে না গতি বাড়িয়ে চলে যাবে বুঝতে পারছেনা।বাপ্পা গাড়ি রাস্তার একপাশে ঘেঁষে চালাচ্ছিল যাতে মেয়েটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া যায়। কিন্তু যতই গাড়ি এদিক-ওদিক পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে মেয়েটি ও অদ্ভুতভাবে ডায়ে বাঁয়ে সরছে। বেগতিক বুঝে বাপ্পা জানলার কাঁচ সমপূর্ণ তুলে দিয়ে যা হয় হবে ভেবে স্পীড বাড়িয়ে দিল। এবং লক্ষ্য করল, ঠিক চরম মুহূর্তে মেয়েটি যখন গাড়ির একদম সামনে এসে পড়েছে, তখন তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এবং গাড়িতে ধাক্কা লেগেই মিলিয়ে গেল। ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ির সামনের কাঁচে যেন একটা কুয়াশার ঝাপটা লেগে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পরতে দেখা গেল।”
আমরা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছি, পরিবেশ বেশ থমথমে। চপে একটা কামড় দিয়ে অমিত বলল, তারপর কি হল?
পদ্মনাভ বলল – “তারপর বেশ কিছুক্ষণ আর কিছুই ঘটল না। গাড়ির হেড লাইটের আলো সামনের রাস্তা আলোকিত করে ছুটে চলল। প্রায় আধ ঘণ্টা পর ওরা যখন একটু ধাতস্ত হল, তখন জানলার কাঁচ নামিয়ে দিল। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার, ডায়ে বাঁয়ে গাছের সারি।
হঠাৎ টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হল। এমনিতেই গরম ছিল, টিপ টিপ বৃষ্টিতে হালকা ঠান্ডা একটা বাতাস জানলা দিয়ে গায়ে লাগছিল। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি জোরে শুরু হওয়ায় উত্তম ওর সাইডের জানলার কাঁচ তুলে দিয়ে, বাপ্পার সাইডের জানলার দিকে তাকাতেই বুক হিম হয়ে গেল। ওর গলা থেকে কথা বেরোচ্ছে না, ও চাইছে তাও বলতে পারছে না।
ও দেখল চলন্ত গাড়িতে একটা মেয়ে দুটো হাত দিয়ে গাড়ির জানলা ধরে মাথা গলিয়ে ঝুলে আছে, আর তার বাকি শরীর গাড়ির বাইরে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কারন তার মাথা নিচু করা তাই লম্বা চুলে মুখ ঢেকে গেছে।
উত্তমকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাপ্পা ওকে ঠেলা দিয়ে বলল কিরে কি দেখছিস? উত্তমের মুখ দিয়ে কথা বেরোল না ও শুধু আঙ্গুল তুলে বাপ্পাকে ওর পাশের জানলার দিকে দেখালো। বাপ্পা ওর পাশের জানলার দিকে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেল না। খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে আর মাঝে মাঝে বৃষ্টির ঝাপটা আসছে। ও উত্তম কে জিজ্ঞাসা করলো কি রে কি দেখলি? বল? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
এতক্ষণে উত্তম সম্বিত ফিরে পেয়ে বাপ্পাকে বলল তুই সত্যিই কিছু দেখতে পাচ্ছিস না? বাপ্পা বলল কই না তো? কি দেখতে পেলি তুই?
উত্তম এখনো দেখতে পাচ্ছে মেয়েটি ওইভাবেই মাথা ঝুলিয়ে আছে জানলায়, ঠিক বাপ্পার পাশে। ও কাঁপা কাঁপা গলায় বললো জানলার কাঁচটা তুলে দে তারপর বলছি।
আশ্চর্যভাবে বাপ্পা ওর পাশের জানালার কাঁচ তুলতে তুলতেই উত্তম দেখল মেয়েটি হঠাৎ আর নেই। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল দূরে রাস্তার উপর আবছা আলোয় মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে দুই হাত মাথার উপর তুলে। তারপর বাকি রাস্তা ঠিকভাবেই ফিরেছিল এবং বাপ্পাকে সব খুলে বলেছিল।” এই বলে পদ্মনাভ থামল।
আমরা একমনে ওর কথা শুনছিলাম। একটা জিনিস খেয়াল করেছি যখন ভূতের গল্পের আসর জমে ওঠে তখন সবারই মনে ভুতের একটা ভয় জেগে ওঠে। তখন সবকিছুতেই অস্বাভাবিকতা দেখতে পায়। তো সেই ভয়েই হোক বা অন্য কিছুতে, আমি কিন্তু হঠাৎ একটা ব্যাপার দেখে চমকে উঠলাম।
আসলে আগেই বলেছি আমরা লজের সামনের গার্ডেনের এক জায়গায় গোল করে ঘিরে গল্প করছি। তো যেখানে আমরা বসে আছি সেখান থেকে লজের শেষের দিকের জানলা গুলো দেখা যায়। আমি জানি ওটা বাথরুমের জানালা । সবাই যখন গল্পে মশগুল ছিল আমি কিছুটা আনমনেই লজের বাইরের চারপাশটা দেখতে দেখতেই গল্প শুনছিলাম। এমনিতে সরকারি পুরনো লজ, এখন অন্ধকারে কেমন যেন ভুতুড়ে লাগছে। হঠাৎ বাথরুমের দিকের জানলায় দেখি কে একজন আমাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে কোন মেয়ে বলেই মনে হলো। পরক্ষনেই দেখলাম আর নেই। ঠিক এক কি দু সেকেন্ডে দেখেছি, তাই বুঝতে পারলাম না সত্যিই দেখলাম নাকি পদ্মনাভর গল্পের প্রভাব।
প্রায় ঘন্টা দুয়েক আড্ডা গল্প করে আমরা কয়েকজন বাজারের দিকে গেলাম, বাকিরা গার্ডেনে গল্প করতে লাগল। বাজার লাগোয়া একটা দোকান থেকে বেশকিছু হাতে বানানো রুটি ও কষা মাংস প্যাক করে নিলাম রাতে সবার খাবার খাওয়ার জন্য।
খাবার নিয়ে দশটা নাগাদ লজে পৌঁছে দেখি গার্ডেন ফাঁকা, সবাই রুমে চলে গেছে। দোতালায় উঠে দেখি বারান্দায় শুভাশিস পায়চারি করতে করতে ফোনে কথা বলছে, আর বাকিরা রুমে। আসলে আজ সবাই একটু ক্লান্ত। ট্রেন থেকে নামার পর থেকে এখন অব্দি বেশ হৈচৈ আনন্দ করে কাটলো। তাই এখন খেয়ে দেয়ে ঘুম দরকার সবার।
রাতের খাওয়া সেরে আমার একটু টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হল। একা যেতে গিয়েও কেন জানিনা একটু ভয় করল। হয়তো জানলার সেই মূর্তির কথা ভেবে। আমার রুমে আমি আর জয়ন্ত থাকবো ঠিক হয়েছে। জয়ন্ত কে বললাম শোয়ার আগে টয়লেট করে আসি তুমি কি যাবে? জয়ন্ত দেখি আমার কথায় ঘাড় নেড়ে বললো হ্যাঁ আমারও পেয়েছে চলো রাতে আর উঠবো না। রুম থেকে বেরিয়ে সরু বারান্দা দিয়ে দুপাশে আরো ঘর পেরিয়ে যেতে যেতে মনে হল সত্যিই রাতে কারোর বাথরুম ফেলে একা যাবার হয়তো সাহস পাবে না। বারান্দাটায় দুটো মাত্র টিউব লাইট জ্বলছে একটা এই মাথায় অর্থাৎ আমাদের ঘরের দিকে আর অপরটা বারান্দাটার শেষ মাথায়। তাই অল্প আলোতে বেশ ভয় ভয় করছিল আমার। ডায়ে ঘুরে দেখি বাথরুমের দিকে অন্ধকার। দেওয়ালের সুইচ খুঁজে অন করতেই বাথরুমের আলো জ্বলে উঠলো। বাথরুম সেরে বেরিয়ে দেখি জয়ন্তর তখনো হয়নি তাই আমি একটু অপেক্ষা করতে লাগলাম। আস্তে আস্তে বাথরুমের জানালার কাছে গিয়ে নিচের গার্ডেনের দিকে তাকালাম যেখানে আমরা বসে ছিলাম। হঠাৎ জয়ন্তর গলার আওয়াজ পেয়ে পেছন ফিরে দেখি ও হাত ধুতে ধুতে বলছে চলো কমপ্লিট। রুমে আসার সময় বাকিদের রুমে অন্যদের গুডনাইট বলে এলাম। দেখি জিশান আর দেবজ্যোতি একটা রুমে, পদ্মনাভ ওয়াসিম একটা রুমে, শুভাশিস অমিত একটায়, আর মৃন্ময় আর সুমন একটায় শুয়েছে।
জয়ন্ত আর আমি শুয়ে পড়লাম, রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। সারাদিনের ক্লান্তি থাকায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুম যখন ভাঙলো তখন কত রাত জানিনা। মোবাইলের আলোয় দেখলাম পৌনে তিনটে। ঘরের ফ্যান দেখি বন্ধ, তাই গরমে অস্বস্তিতে বোধহয় ঘুম ভেঙে গেছে। মোবাইলের টর্চের আলোয় দেখলাম ফ্যানের সুইচ অনই আছে, তারমানে লোডশেডিং। জয়ন্তর দিকে তাকিয়ে দেখলাম বেচারা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জানলা দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া আসছে ঠিকই কিন্তু দেখলাম তার একটা পাল্লা বন্ধ । তাই বোধহয় হাওয়া সেরকম ঘরে ঢুকতে পারছে না। উঠে গিয়ে জানলাটা ভালো করে খুলে দিলাম, বাঃ বেশ হাওয়া আসছে এবার। আবার গিয়ে শুলাম, কিন্তু ঘুম এলো না। চুপচাপ শুয়ে আছি দূর থেকে ঢেউয়ের ক্রমাগত আছড়ে পড়ার শব্দ শুনছি, এমন সময় সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বারান্দা দিয়ে কেউ যেন পা ঘষটে ঘষটে হাঁটছে। বেশ স্পষ্ট শুনতে পেলাম যখন আমাদের দরজার কাছে এলো আবার চলে গেল আবার এলো আবার চলে গেল।
যেন কেউ বারান্দায় পায়চারী করছে। এখন রাত প্রায় তিনটে, কে এখন পায়চারি করতে যাবে এত রাতে?
প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। সত্যি বলতে কি দরজা খুলে বাইরে বেরুবার সাহস হচ্ছিল না। তাই বন্ধুদের মধ্যে কেউ হতেও পারে এই ভেবে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। জানলা দিয়ে ভালোই হাওয়া আসছিল তাই একটু একটু ঘুমও আসছিল। হঠাৎ সেই হাওয়া কমে যেতে জানলার দিকে তাকিয়ে দেখতেই সারা শরীর হিম হয়ে গেল। অন্ধকারে দেখলাম জানলার ওপারে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে দেখছে আমাদেরকে, তারপর আস্তে আস্তে জানালার একটা পাল্লা বন্ধ করে দিচ্ছে। ভয়ে আমার বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল, ভয় হলো ওই ছায়ামূর্তি বুঝে যাবে না তো যে আমি দেখতে পাচ্ছি তাকে। কে ওটা? চোর? নাকি অশরীরী কেউ? আমরা আছি দোতালায় সুতরাং দোতালার জানলায় এত উঁচুতে তো চোরের নাগাল পৌঁছাবার কথা নয়। খেয়াল করলাম এখন বারান্দা দিয়ে পা ঘষটে ঘষটে হাঁটার আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেছে। চুপচাপ মরার মত শুয়ে থাকলাম।
জানলার একটা পাল্লা বন্ধ করে দিয়ে আরও কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো ছায়ামূর্তিটা। অন্ধকারে কোন মেয়ে বলেই মনে হলো, সঙ্গে সঙ্গে গা টা ছ্যাঁত করে উঠলো। গার্ডেনে বসে গল্প করতে করতে বাথরুমের জানলায় দেখা সেই ছায়ামূর্তির কথা ভেবে। একেই তাহলে দেখেছিলাম!
চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল হয়ে গেছে। চোখ খুলে দেখি জয়ন্ত নেই পাশে, দরজা খোলা। উঠে দেখলাম বারান্দায় পদ্মনাভ আসছে বাথরুমের দিক থেকে। ওকে বললাম জয়ন্ত কে দেখেছো? বললো হ্যা বাথরুমে আছে। একটু যেন স্বস্তি পেলাম। সকালের চা টিফিন সেরে একটা ভ্যান ভাড়া করে আজ আমরা তালসারি তে বেড়াতে যাব প্ল্যান করাই ছিল। তো সেই মতো তালসারি যাওয়ার পথে জয়ন্ত কে রাতের ব্যাপারটা বললাম ও দেখলাম বেশ সহজ ভাবেই নিল কথাটা। বলল ক্লান্ত ছিলে তো তাই কোনো স্বপ্ন দেখেছিল হয়তো।
আমার কিন্তু পুরো মনে আছে যা যা কাল হয়েছিল। স্বপ্ন এত পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে থাকে নাকি? যাইহোক বাকি বন্ধুদের আর বললাম না যদি হাসাহাসি করে ভীতু ভাবে আমাকে। আজ শনিবার আজকের দিনটা থেকে কাল অর্থাৎ রবিবার দুপুরের ট্রেনে ফিরব।
তালসারি তে সবাই খুব আনন্দ করলাম সমুদ্র স্নান করলাম, এখানে বিচে কোলাহল খুব একটা নেই বেশ ফাঁকা । দুপুর একটা নাগাদ ফিরলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে আজও বিচে গেলাম কিন্তু আজ আমার মন একটু অন্য মনস্ক হয়ে রয়েছে। সারাদিন কিছুতেই বন্ধুদের সাথে আনন্দে মেতে উঠতে পারছিনা। গতকাল রাতের ঘটনার ব্যাখ্যা খুজে পাচ্ছিনা।লজে একটু তাড়াতাড়িই ফিরলাম। প্ল্যান ছিল আজ রাতের খাবার বানাবার অর্ডার দিয়ে লজের গার্ডেনে আড্ডা মারব এবং গার্ডেনেই রাতের খাওয়া সারব। এমনিতে গার্ডেনে বসলে বেশ ভালই লাগে, সমুদ্রের হাওয়া এখান থেকে হুহু করে বয়ে যায়। বেশ খানিকক্ষণ গল্প করার পর কয়েকজন বন্ধু গেল অর্ডার দেওয়া খাবার গুলো আনতে। লজের একটা কর্মচারীকে বলে একটা প্লাস্টিকের টেবিল আর কয়েকটা চেয়ারের ব্যবস্থা করা হলো।
কাল দুপুরে ট্রেন তাই আজ সবাই একটু রাত করেই শোবো ঠিক করেছি। টেবিলে গোল করে ঘিরে বসেছি সবাই। একটা আলোরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাই হোক রাত প্রায় বারোটা অবধি খাওয়া-দাওয়া গল্প করতে করতে কাটালাম, তারপর সবাই শুতে গেলাম। কাল তাড়াতাড়ি ওঠার ঝামেলা নেই, কারণ কোথাও বেড়াতে যাওয়ার নেই। তাই বেলা করে ঘুম থেকে উঠবো। জয়ন্ত আর আমি আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ঘুমিয়ে পড়লাম। বেশ অঘোরেই ঘুমাচ্ছিলাম, ঘুম ভাঙলো জয়ন্তর ধাক্কায়। ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, দেখো বারান্দায় কে যেন হাঁটছে পা ঘষে ঘষে?
কান পেতে শুনলাম সত্যিই তাই, ঠিক আগের দিনের রাতের মতো। জয়ন্তকে বললাম দেখেছো কাল আমি এই শব্দটার ই কথা বলছিলাম, তারপর জানলায় ওই মূর্তিটা কে দেখি। ভয়ে দুজনে জানলার দিকে তাকিয়ে সিটিয়ে রইলাম। হঠাৎ দেখি কারেন্ট চলে গেল, ফ্যান বন্ধ হয়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিলাম। চুপচাপ বসে আছি বুক দুরুদুরু করছে। পা ঘষে ঘষে চলার আওয়াজটা এখনো হচ্ছে, যেন কেউ হাঁটতে হাঁটতে সোজা দোতালার বারান্দার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত পায়চারি করছে। একটু পর দেখলাম আওয়াজটা আমাদের রুমের কাছে এসে থেমে গেল। সব চুপচাপ, ভয়ে দুজনে জড়সড় হয়ে বসে আছি। হঠাৎ দরজায় ঠকঠক করে আওয়াজ হল। কেউ যেন বাইরে থেকে দরজায় টোকা মারছে। একবার, দুবার, তিনবার। তারপর আবার সব শান্ত। আবার শুনলাম পা ঘষে ঘষে চলার শব্দ, এবার ওদিকের একটা রুমের দরজায় টোকার আওয়াজ পেলাম। তারপর অন্য আরেকটায়, তারপর আবার চুপ। ঘড়ি দেখলাম রাত এখন আড়াইটে। ভোর চারটে পর্যন্ত জেগে কাটালাম দুজনে। যদিও বাকি রাতটা আর সেই আওয়াজ শোনা যায়নি, তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম দুজনে। সকালে ঘুম ভাঙল নটা নাগাদ। জয়ন্ত দেখি পাশে নেই, দরজাও খোলা। উঠে পড়ে বেরিয়ে দেখি শুভাশিসদের রুমে জয়ন্ত, সুমন, অমিত বসে গল্প করছে, আমিও গিয়ে বসলাম। কাল রাতের ঘটনা প্রসঙ্গে আলোচনা চলছে। বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ বলছে কিছু শোনেনি কেউ বলছে শুনেছে, যারা শুনেছে তারা ভয়ও পেয়েছে।
যাই হোক আমাদের ট্রেন বেলা সাড়ে বারোটায়, এখন বাজে সাড়ে নটা। ফ্রেশ হয়ে চা জলখাবার খেতে বাইরে বেরুলাম। আজ সবাই একসাথে বেরুইনি, বন্ধুদের কয়েকজন আমাদের একটু আগে উঠে সমুদ্রের ধারে গেছে হাঁটতে। আমরাও চা জলখাবার খেয়ে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে দেখি ওরা একটা ডাব ওয়ালার শামিয়ানার তলায় বসে ডাব খাচ্ছে। আমরাও গিয়ে বসলাম।
সুমন বললো জিশান কই? সত্যিই তো জিশানকে তো দেখছিনা। পদ্মনাভ বলল আমরা ভাবলাম রুমেই আছে তোদের সাথে আসছে। আমি বললাম না তো আমাদের সাথে তো আসেনি উল্টে আমরা ভাবলাম তোমাদের সাথে বিচে এসেছে। দেবজ্যোতি কে জিজ্ঞাসা করলাম যে সে জিশানকে দেখেছি কিনা ঘুম থেকে উঠে। কারণ ওরা দুজনে এক রুমে ছিলো। ও বলল যে, না ও ঘুম থেকে উঠে জিশানকে দেখতে পায়নি ও ভেবে ছিল বাথরুম গেছে হয়তো।
পদ্মনাভ বলল দেখ হয়তো একাই ঘুরছে কোথাও লজে ফিরেই দেখতে পাবো, জিনিসপত্র গোছাতে হবে তো তখন ঠিক ফিরে আসবে। আজ আর বেশিক্ষণ সমুদ্রের ধারে বসলাম না। লজে ফিরে স্নান সেরে জিনিসপত্র গুছিয়ে খেয়েদেয়ে বারোটা নাগাদ বেরোবো। লজে ফিরে জিশানকে দেখতে পেলাম না ওর ফোনে ফোন করছি রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছেনা বেজেই যাচ্ছে। এবার সবাই সত্যিই দুশ্চিন্তায় পড়লাম, বারবার ওর মোবাইলে ফোন করছি ফোন ধরছেনা। হঠাৎ সুমন দৌড়াতে দৌড়াতে বারান্দা দিয়ে এসে বলল যে ও নাকি বাথরুমে গিয়েছিল, মোবাইলের আওয়াজ শুনে বাথরুমে যাওয়ার বাম দিকের ঘরে উঁকি মেরে দেখে জিশান উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, অথচ ঘরে তালা মারা।
সবাই দৌড়ে গেলাম দোতালার শেষ ঘরটায়, যেটার কথা আগেই বলেছিলাম। গিয়ে দেখি সত্যিই তাই। দরজায় তালা মারা কিন্তু জিশান ভিতর শুয়ে মেঝেতে। ঘরটিতে ঢোকার আর কোনো উপায় নেই। জানলা দিয়ে আমরা সবাই ডাকাডাকি করছি কিন্তু জিশান উঠছে না।
সবাই খুব ঘাবড়ে গেলাম, বেশ একটা হুলছুল বেধে গেল। নিচ থেকে লজের কর্মচারীরা উঠে এল চাবি নিয়ে। ঘর টা খুলে জিশানকে বার করা গেল শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। একটু যেন ধড়ে প্রাণ এল সবার। সবাই মিলে ধরাধরি করে একটা রুমে নিয়ে গিয়ে ওকে শোয়ালাম। চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে জ্ঞান এল। আস্তে আস্তে চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে লাগল সবাইকে। যেন সবাই ওর অচেনা, কাউকে চিনতে পারছে না। ওকে জিজ্ঞাসা করা হল, কিরে কী হয়েছিল? কী করে গেলি ওই ঘরটায়?
জিশান চুপচাপ তাকিয়ে আছে, দৃষ্টি ঘোলাটে। হঠাৎ জিশান এর গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল “আমাকে ছেড়ে দে তোরা” বলেই গোঙাতে লাগলো।
আমরা সবাই চমকে গেলাম। এ যে জিসানের আওয়াজই নয়। এটা কার আওয়াজ জিসানের গলা দিয়ে বেরুচ্ছে? কর্কশ ভয়ানক একটা আওয়াজ।
ভয়ে কয়েকজন পিছনে সরে এলাম। বিছানা থেকে উঠে পড়তে চাইছে ও। কিছুতেই আটকে রাখতে পারছিনা সবাই মিলে। লজের কর্মচারী গুলো দেখি এ ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে, ফিসফিস করে কি কথাবার্তা বলছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ওরা কিছু জানে এই ব্যাপারে, কিন্তু ব্যাপারটা লুকোচ্ছে। জেনেও না জানার ভান করে চুপচাপ আছে।
জিশান এর ওই রকম অবস্থা দেখে সবাই ঠিক করলাম আজ আর যাওয়া হবে না। এই অবস্থায় ওকে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আস্তে আস্তে দেখি গজরাতে গজরাতে আবার অজ্ঞান হয়ে গেল।
লজের কর্মচারীদের মধ্যে এক বয়স্ক ব্যক্তি আমাকে আর পদ্মনাভ কে ডেকে বললো দাদাভাই আপনাদের বন্ধু কে ভুতে ধরেছে। যদি ওকে বাঁচাতে চান আজই ফিরে যান। এখানে থাকলে ওকে আরো আকর্ষন করবে, তখন কিন্তু ও আরো সাংঘাতিক হয়ে উঠবে বিশেষ করে রাতে। আমি বললাম কিন্তু এই অবস্থায় ওকে ট্রেনে নিয়ে যাব কি করে?
লোকটি বলল, দেখুন রাতে ওদের আকর্ষণ শক্তি প্রবল হয় কিন্তু দিনের বেলায় ততটা হয় না। তাই আপনার বন্ধু এখন অজ্ঞান হয়ে রয়েছে। তার মানে প্রেত এখন ওর কাছে নেই। এ রকমই হয় দিনের বেলা, মাঝে মাঝে আসবে প্রেতটা আবার চলে যাবে। এত লোকের মাঝে ওরাও অস্বস্তি বোধ করে কিনা। কিন্তু রাতে ওদের শক্তি এতটাই বেড়ে যায় যে তখন সবাই মিলেও কিছু করতে পারবেন না।
পদ্মনাভ বলল, এরকম একটা প্রেতের উৎপাত হয় আগে বলেননি কেন আপনারা? লোকটি বলল আমি সামান্য এক কর্মচারী তাছাড়া ভূতের উপদ্রব শুনলে লজ ভাড়া নেবে না কেউ। আমাদের চাকরি যাওয়ার ভয় থাকবে। এমনিতে দোতালার শেষ ঘরটি সারাবছর তালা বন্ধই থাকে। ওই ঘরটিতেই যত কান্ড হয়, তাই ওটা ভাড়া দেওয়া হয় না। বাকি ঘরগুলোতে খুব একটা উপদ্রব ঘটে না সাধারণত, টুকটাক আওয়াজ ছাড়া। আমি এসব বলেছি দয়া করে কাউকে বলবেন না। আপনাদের ভালোর জন্যই বললাম যত তাড়াতাড়ি পারেন আজই ফিরে যান। সাধারণত প্রেতদের একটা এলাকা থাকে। আমার মনে হয় একবার ট্রেন ছাড়লে বেশিদূর আপনাদের পিছু নেবে না ও। আপনাদের বন্ধু সুস্থ হয়ে উঠবে তখন।
বাকি বন্ধুদের ডেকে বললাম সব কথা। তখনই সবাই ব্যাগ পত্র গুছোতে লেগে গেলাম। ঠিক হলো দুপুরের ট্রেনেই ফিরব। জিশান এখন ঘুমোচ্ছে। তাড়াতাড়ি ব্যাগ পত্র গুছিয়ে রওনা দিলাম স্টেশনের দিকে। ওই অবস্থাতেই ওকে ট্রেনে চাপলাম। বাকি প্যাসেঞ্জাররা অবাক হয়ে দেখতে থাকলো আমাদের।
ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা ঘটল যখন ট্রেন ছেড়েছে তখন। হঠাৎ দেখি সোজা হয়ে বসেছে জিশান। চোখ একই রকম ঘোলাটে, মুখ থেকে ফ্যানা পড়ছে। রাগে গজরাতে গজরাতে অমানুষিক গলায় বলছে, “এত সাহস তোদের আমাকে নিয়ে যাস? ছাড় আমাকে! আমি ফিরে যাব! না হলে কিন্তু আমি কাউকে ছাড়বো না! ছাড় বলছি।”
আমাদের কামরার বাকি প্যাসেঞ্জাররা ভয় পেয়ে গেল। আমরা সবাই ওকে একটা সিটে চেপে ধরে রেখেছি। ট্রেনের কয়েকজন প্যাসেঞ্জার এগিয়ে এলো আমাদের সাহায্য করতে। সবাই মিলে প্রথমে বাধলাম ওকে, তারপর চেপে ধরে বসে রইলাম।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে জিশান গজরে চলেছে, “ছাড় আমাকে! কাউকে ছাড়বো না! মেরে ফেলবো সবাইকে।”
আমরা ইষ্ট নাম জপ করতে করতে চেপে ধরে রেখেছি ওকে। এভাবে প্রায় এক ঘন্টা পর দেখি জিশান আস্তে আস্তে আবার নিস্তেজ হয়ে আসছে। একসময় আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। ট্রেন এখন কোলাঘাট পেরিয়ে ছুটে চলেছে। আমরা একটু নিশ্চিন্তে বসলাম এবার। ওর বাঁধন খোলা হয়নি, যদি আবার জেগে ওঠে তাই। সবাই ওর দিকে তাকিয়ে বসে আছি ভয়ে ভয়ে।
দেখলাম আর কিছু ঘটলো না চুপচাপ ঘুমোচ্ছে ও। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ট্রেন যখন সবে ধুলাগড় পেরিয়ে কিছুটা গিয়েছে, দেখি আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরছে জিশানের। আমরা আবার উৎকণ্ঠা নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। জিশান দেখি ধীরে ধীরে চোখ খুলে আমাদেরকে দেখছে। দৃষ্টি এখন স্বাভাবিক, আগের মত ঘোলাটে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছিল আমার? আমাকে বেঁধে রেখেছিস কেন তোরা?”
লক্ষ্য করলাম ওর গলার স্বর একদম স্বাভাবিক। অমিত বলল, তোর কিছু মনে নেই? পদ্মনাভ বলল, ঠিক আছে বাঁধন খুলে দিচ্ছি শুয়ে থাক পরে মনে করে বলিস কি হয়েছিল।
বাঁধন খুলে দিতেই জিশান উঠে বসলো। তারপর বললো, “কাল রাতে ঘুমাচ্ছিলাম, দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। দেবজ্যোতি কে ডাকতে গিয়ে দেখি অঘোরে ঘুমোচ্ছে ও। আমি তখন ভাবছি বন্ধুদের মধ্যে কেউ হয়তো জেগে আছে, সেই হয়তো শয়তানি করছে। আবার দরজায় টোকা পড়তেই দরজা খুলে বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি কেউ নেই। বাঁদিকে বাথরুমের দিকে তাকাতেই দেখলাম কে একজন দৌড়ে পালালো বাথরুমের দিকে। আমি তখন নিশ্চিত যে বন্ধুদের মধ্যেই কেউ ভয় দেখাচ্ছে, তাই হাতেনাতে ধরার জন্য এগিয়ে গেলাম বাথরুমের দিকে। লাইট জ্বালালাম জ্বলল না। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে বাথরুমে কাউকে না দেখতে পেয়ে ফিরে আসার সময় ওদিকের ঘরটায় কি যেন একটা শব্দ পেয়ে এগিয়ে গেলাম। দরজায় তালা মারা ছিল, তাই পাশের জানলা দিয়ে টর্চ জ্বেলে উঁকি মেরে দেখি ঘরে কেউ নেই। হঠাৎ উপরে নজর পড়তেই দেখলাম একটা মেয়ে গলায় দড়ি লাগানো অবস্থায় ফ্যান থেকে ঝুলছে। তার চোখ বেরিয়ে আছে, আমায় দেখছে।
আমি ভয়ে অবশ হয়ে গেলাম। ছুটে পালাবার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। চুপচাপ জানালা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। সারা গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। হঠাৎ দেখি মেয়েটা চোখের পলক এর মধ্যেই জানলায় এসে দাঁড়িয়েছে, আর আমার হাত দুটো চেপে ধরেছে। একটা বিশ্রি পচা গন্ধ আসছিল তার গা থেকে। তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, আর কিছু মনে নেই।
আমরা অবাক হয়ে ওর কথা শুনছি। এমন সময়ে জিশান বলল, “আমার মোবাইল কোথায়? তোদের কাছে?”
আমরা বললাম আমাদের কাছে তো নেই। সুমন বলল সকালে বাথরুমে যাওয়ার সময় তুই যেই ঘরে পড়েছিলি ও ঘর থেকেই তোর ফোনের আওয়াজ পাচ্ছিলাম। সত্যি তো এত কিছু ঘটনার মাঝে মোবাইল টার কথা কারোরই মনে হয়নি, সবাই ভেবেছিল ওর কাছেই আছে।
পদ্মনাভ বলল, দাঁড়া ফোন করে দেখি লজের কোন কর্মচারী যদি পেয়ে থাকে। এই বলে পদ্মনাভ জিসানের মোবাইলে ফোন করলো। আমরা সবাই উৎসুক ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। সুমন বললো কি হলো কেউ ধরল? পদ্মনাভ বলল রিং হচ্ছে। হঠাৎ পদ্মনাভ চমকে উঠে ফোনটা কান থেকে সরিয়ে নিল। আমরা বললাম কি হলো? ও তখন ফোনটা লাউডস্পিকারে দিল। ওপার থেকে ভয়ঙ্কর অপার্থীব গলায় একটা মেয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
হিঃ হিঃ করে হেসে সে বলল, “আবার আসবেন কিন্তু?”
Published on Friday, 16 July 2021, 11:40 am | Last Updated on Friday, 16 July 2021, 11:41 am by Bahok Desk



