
Table of Contents
Bahok News Bureau: যদি প্রশ্ন করা হয়, ভারতীয় রেলের জনক কে?, তাহলে সবাই হয়তো এক সুরে বলবেন ‘লর্ড ডালহৌসী’। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ভারতীয় রেলে ‘টয়লেটের’ জনক কে? তাহলে কী আপনি বলতে পারবেন? এর উত্তর হল একদমই সাধারণ একজন মানুষ। যার ঐতিহাসিক চিঠি উথালপাথাল করে ভারতীয় রেলের পুরনো রীতিনীতিকে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। আগে কোনো রেলযাত্রীকে ‘প্রকৃতির ডাকে সাড়া’ দিতে গেলে পরবর্তী রেল স্টেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এবার এর মধ্যে কারোর যদি ‘হালকা’ হওয়ার প্রয়োজন মনে হতো, তখন তাঁর কী পরিস্থিতি তৈরি হতো ভেবেই নিন।
দূরপাল্লার ট্রেনে সমস্ত শ্রেণীতে ‘টয়লেট’ না থাকলে কী হতো?
চলুন কিছুক্ষণের জন্য সময়ের সফর করা যাক। ধরে নেওয়া হোক, আপনি ৩০২২ সালে বাস করছেন। টাইম মেশিন আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। এই অবস্থায়, আপনি সেই টাইম মেশিন ব্যবহার করে পৌঁছে গেছেন ১৯০৮ সালে। হাতঘড়ি টিকটক করছে, হাতে দেখলেন ১ ঘণ্টার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। টাইম মেশিনের গোলযোগের কারণে, আপনি নিজের ইচ্ছেমতো স্থান ‘পৈতৃক বাড়িতে’ স্থানান্তরিত না হয়ে নিজেকে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে দেখতে পেলেন। প্রচণ্ড রকমের ভিড়, ঠেলাঠেলি ও চাপাচাপি চলছে রীতিমতো। আপনি প্রথমে ভাবলেন, “পরাধীন ভারতে ট্রেন যাত্রা করছি, একটু ট্রেন সফরটার উপভোগ করা যাক, যেমনই হোক না কেন”।
আরও পড়ুন: Jatindra Nath Das Death Reason: যতীন্দ্রনাথ দাস স্মরণীয় কেন?, মৃত্যুর কারণ ও জীবনী

এরপরে ট্রেন দৌড়াচ্ছে, এরই মাঝে আপনার ‘প্রকৃতির ডাক’ অনুভব করতে পারছেন। প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হচ্ছে, কিন্তু কিছু করার নেই। কারণ আপনি ৩০২২ সালে থাকছেন না, আপনি রয়েছেন ১৯০৮ সালে। তখনও তো আর ট্রেনে ‘টয়লেট’ ব্যবস্থা শুরু হয়নি। শুরু হয়েছে এক ঐতিহাসিক ঘটনার পরে। এইবার ভাবুন আপনি কী করবেন? ‘প্রকৃতির চাপে’ আপনার মাথায় ঘাম জমতে শুরু করেছে। ভেতর থেকে নিজেকে খুব অস্থির মনে হচ্ছে। চারিদিক শোরগোল দেখে মনে হচ্ছে, কী হচ্ছে কেন হচ্ছে! নিজেকে এই বাস্তব জগতের বাইরে নিজেকে অনুভব করতে শুরু করলেন। প্রাণ না গেলেও, মনে হচ্ছে ‘মান-সম্মান’ এই গেল আর সেই গেল। আর ঠিক সেই সময়েই আপনি আপনার সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন। না, আপনার সঙ্গে ‘অসম্মানজনক’ কোনো ঘটনা ঘটেনি, সেই যে এক ঘণ্টার কাউন্টডাউন চালু হয়েছিল, সেটার সমাপ্তিতেই পৌঁছাতেই শেষ মুহূর্তে আপনি আবার ৩০২২ সালে ফিরে গেছেন। গিয়েই দৌড় দিলেন ‘প্রকৃতির ডাকে সাড়া’ দিতে। এক অসীম শান্তি অনুভব করলেন আপনি (যেটা হয়তো বলে কাউকে বোঝানো পারবেন না!)।
এই সফরে আপনি একটা জিনিস বুঝতে পারলেন বিভিন্ন ট্রেনে ‘টয়লেট থাকার প্রয়োজনীয়তা কী। আগে যে টাকা খরচ করেও দূরপাল্লার ট্রেনে সমস্ত শ্রেণীর যাত্রীরা সেই সুবিধা উপভোগ করতে পারতো না, ‘প্রয়োজনের ডাকে সাড়া’ দিতে পারতো না, সেই কষ্টটাই ভেবে দেখুন একবার। যদিও, এই ২০২২ সালে দাঁড়িয়েও ভারতের লোকাল ট্রেনের যাত্রীরা এখনও ‘টয়লেট’ ব্যবহার করার সৌভাগ্য পাননি।

ভারতীয় ট্রেনে ‘টয়লেট’ যুক্ত হওয়ার ইতিহাস:
যার উদ্যোগে ভারতীয় রেলে ‘টয়লেট’ যুক্ত হয়েছে, তাঁর নাম হল ‘অখিল চন্দ্র সেন’। অবিভাজিত বাংলার ওই সন্তানের দৌলতেই এক ‘ঐতিহাসিক’ আবেদনের পরে বর্তমানে ট্রেনে ‘টয়লেট’-এর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু, ঠিক এমন কী ঘটেছিল যে, সেই পরাধীন ভারতেও ব্রিটিশ সরকার ট্রেনে ‘টয়লেট’ যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল। চলুন জানা যাক, সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাপারে, যার পরে ভারতীয় রেলের ইতিহাস পাল্টে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তবে, চিন্তা করার কিছু নেই, এটা স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘটনা ছিল না, এটা ছিল এক সাধারণ মানুষের ‘দৈনিক অভ্যাসের’ এক চিঠিতে রূপান্তরণের ঘটনা। যা এমনই ছাপ ফেলেছিল যে, রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেনে (লোকাল ট্রেন) ‘টয়লেট’ যুক্ত করতে বাধ্য হন।
রেল কর্তৃপক্ষকে চিঠি প্রেরণকারী অখিল চন্দ্র সেনের জীবনে একদিন একটি ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তিনি চিঠি লেখেন রেল কর্তৃপক্ষকে। সেই ঘটনাটি তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। কিন্তু, সেই ঘটনাটি লেখার ধরণই নজর কেড়েছিল রেল কর্তৃপক্ষের। একদিকে, তাঁর লেখার ধরণটিকে ‘বেশ হাস্যকর’ পেয়েছিল রেল কর্তৃপক্ষ এবং অপরদিকে, দাবিটিকেও বেশ বৈধ খুঁজে পায় তারা। তারপরেই ভারতীয় রেলের ইতিহাসে যুক্ত হয় নতুন অধ্যায়।
অখিল চন্দ্র সেনের চিঠিতে ঠিক কী লেখা ছিল?
অখিল চন্দ্র সেনের চিঠিটি যেহেতু ভারতীয় রেলের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিল, তাই সেই চিঠিটি লিখিত আকারে প্রত্যেকটি অক্ষর সহকারে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে ভারতীয় রেলের মিউজিয়ামে। ১৯০৯ সালের ২রা জুলাই তারিখে তাঁর তরফে লেখা পশ্চিমবঙ্গের সাহেবগঞ্জের সাব ডিভিশনাল অফিসে পাঠানো চিঠিটিতে লেখা ছিল, ”
“I am arrive by passenger train at Abmedpur station and my belly is too much swelling with jackfruit. I am therefore went to privy. Just I doing the nuisance the guard making whistle blow for train to go off and I am running with lota in one hand and dhoti in the next. When I am fall over and expose all my shockings to man and woman on platform. I am got leaved at Abmedpur station.
This too much bad, if passengers go to make dung, the damn guard not wait train five minutes for him? I am therefore pray your honour to make big fine on that guard for public sake otherwise I am making big report to papers.
Your’s faithfully servant,
Okhil Ch. Sen”
এই চিঠির ভাঙাচোরা ইংরেজি ভাষাই পরাধীন ভারতে নজর কাড়ে ভারতীয় রেলের। চিঠির অর্থ,’
“আমি প্যান্সেঞ্জার ট্রেন দ্বারা আহমেদপুর স্টেশনে পৌঁছিয়েছি এবং আমার পেট কাঁঠালের উপস্থিতির কারণে ফুলে গেছে। এই অবস্থায় আমি শৌচালয়ে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। আমি ব্যাস ‘আমার কাজটি’ সারছিলামই, সেই মুহূর্তেই ট্রেন গার্ড ট্রেন ছাড়ার হুইসল বাজিয়ে দেন। এই অবস্থায় আমি এক হাতে ‘লোটা’ ও এক হাতে ‘ধুতি’ নিয়ে পড়িমরি করে দৌড়াতে শুরু করলাম। আর এটাই যেন কাল হয়ে গেল। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই এবং এরপরে আমার ব্যক্তিগত কিছুই আর ব্যক্তিগত থাকেনি, সবই উপস্থিত সমস্ত পুরুষ ও মহিলার সামনে দৃশ্যমান ছিল। আমি আহমেদপুর স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
এটা খুবই খারাপ ব্যাপার! কোনো যাত্রী যদি ‘গোবর’ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, সেই রেল গার্ড কি তাঁর জন্য ৫ মিনিটও দাঁড়াতে পারে না? এই অবস্থায় আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, যাতে আপনারা ওই রেল গার্ডের ‘জরিমান’ নেন। নইলে আমি বড়ো খবর দিচ্ছি সংবাদপত্রগুলোকে”।
আপনার বিশ্বস্ত,
অখিল চন্দ্র সেন,

অখিল চন্দ্র সেনের চিঠির ফলে কী পরিবর্তন এসেছিল?
পূর্বে, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। যা স্বাভাবিকভাবেই খুব চাপের ও অস্বস্তির ছিল। তবে, অখিল চন্দ্র সেনের দৌলতেই ‘টয়লেট’ ব্যবহার করার সুযোগ পান রেলযাত্রীরা। উল্লেখ্য, ভারতীয় রেল তৈরি হওয়ার প্রায় ৫৬ বছর পরে ভারতীয় ট্রেনে ‘টয়লেট’-এর অন্তর্ভুক্তি ঘটে। প্রসঙ্গত, ভারতে প্রথমবার ট্রেন চালু হয় ১৮৫৩ সালে এবং অখিল চন্দ্র সেনের সৌজন্যে ট্রেনে সমস্ত শ্রেণীতে ‘টয়লেট’ বসে ১৯০৯ সালে। এর মাঝে দূরপাল্লার ট্রেনে ১৮৯১ সালে ‘শৌচাগারের’ ব্যবস্থা করা হলেও, অন্য শ্রেণীর যাত্রীদের সেই ব্যবস্থা উপভোগ করার সুযোগ ছিল না। তাই, ভাঙাচোরা ইংরেজিতেও তোলা তাঁর ‘আওয়াজ’ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আরও পড়ুন: Who founded Digha? : ‘দীঘা’র প্রতিষ্ঠাতা কে?, দীঘার কথা ইতিহাসের পাতায়- প্রথম পর্ব
অখিল চন্দ্র সেনের পদক্ষেপ আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
অখিল চন্দ্র সেনের পদক্ষেপ কিন্তু সাধারণ জনজীবনের একটা বিরাট বার্তা বহন করে আনে। কোন মানুষ সমাজের যে স্তরেরই হোক, কোনো মানুষের কর্মজীবন যেমনই থাকুক, কোনো মানুষের ভাষা যেমনই হোক, কোনো মানুষের ভাষার প্রকৃতি যেমনই হোক, ‘আওয়াজ’ তোলা উচিত। বৈধ ও সমাজের স্বার্থে হলে একসময় সমাজের চিরাচরিত ভীত নড়তে বাধ্য!!! একটা সাধারণ ‘আওয়াজ’ও যে সমাজে প্রভাব ফেলতে অখিল চন্দ্র সেনের পদক্ষেপই সেটার প্রমাণ।
Published on Sunday, 18 September 2022, 2:57 am | Last Updated on Sunday, 10 December 2023, 10:49 pm by Bahok Desk








